মুক্তিযুদ্ধে আশুগঞ্জে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর শহীদ সৈন্যদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ব নির্মাণ একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ

অধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান আলম সাজু: মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর পর স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সৈনদের স্মরণে আশুগঞ্জে নির্মিত হতে যাচ্ছে একটি স্মৃতি সৌধ ও মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর কমপ্লেক্স । একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের শেষ সময়ে ৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জে এক ভয়াবহ যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গকারি ভারতীয় সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা সহ বিপুল সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। তাদের স্মৃতির রক্ষার্থেই বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের যৌথ উদ্যোগেই এই স্মৃতি সৌধ ও যাদুঘর নির্মাণ করছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষিকী ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণ জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশে অবস্থানকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে স্মৃতি সৌধটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন বলে জানা গেছে।

উল্লেখ্য বাংলাদেশের সীমান্ত জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ মুক্তিযুদ্ধের তীর্থ ভূমি। ভৌগোলিক কারণে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা-মিত্র বাহিনী ও শত্রু বাহিনী উভয়েরই আশুগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে রাখার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল। আশুগঞ্জ যার যার নিয়ন্ত্রণে রাখা তখন উভয়ের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে জন্য মুক্তিযুদ্ধের সূচানা লগ্নে ও বিজয়ের শেষ প্রান্তে আশুগঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও পাক হানাদার বাহিনীর মধ্যে ব্যাপক যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধে জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও হয়।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আশুগঞ্জই একমাত্র যুদ্ধক্ষেত্র যেখানে আকাশ পথে বিমান,নৌপথে গানবোট এবং স্হল পথে ট্যাঙ্ক ব্যবহৃত হয়েছিল। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত গবেষণা এবং লেখালেখি হয়েছে সবখানেই ১৪ এপ্রিলের আশুগঞ্জ প্রতিরোধ যুদ্ধ এবং ৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ পুরুদ্ধার যুদ্ধের বর্ণনা বিশেষ গুরুত্বের সাথে উল্লেখ রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের জাতীয় পর্যায়ে যারা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছেন তাদের অনেকেই আশুগঞ্জের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। বিশেষ করে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান জেনারেল কে এম সফিউল্লাহ, সেনা প্রধান লেঃ জেঃ নাসিম,মেজর জেনারেল হেলাল মুর্শেদ খান (তাঁর শরীরে এখনো ১৪ এপ্রিল আশুগঞ্জ প্রতিরোধ যুদ্ধের বোমার স্পিন্টার রয়েছে), মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভুইয়া, মেজর জেনারেল আইন উদ্দিন ও মেজর নাসিরের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ আট বছরের গবেষণার ফসল আমার লেখা “মুক্তিযুদ্ধ এবং আশুগঞ্জ” গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৩ সালে এবং দ্ধিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় ২০১১ সালে। বর্তমানে তৃতীয় সংস্করণের প্রস্তুতি চলছে।

একাত্তরের ৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জের সোহাগপুর ভারতীয় মিত্র বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভয়াবহ যুদ্ধে মিত্র বাহিনী ও পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহতম এই যুদ্ধে ভারতীয় মিত্র বাহিনী ট্যাংক ও যুদ্ধ বিমান ব্যবহার করার পরও তাদের কয়েকজন অফিসার সহ বিপুল সংখ্যক (কারো কারো মতে শতাধিক,কারো কারো মতে নিহতের সংখ্যা আরো বেশি) সৈন্য নিহত হয়। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর গোয়েন্দাদের ভুল তথ্যের ভিত্তিতে ৯ ডিসেম্বর বিকাল তিনটায় এই হামলা পরিচালনা করতে গিয়েই এই ভয়ানক ও দুঃখজনক পরিণতির শিকার হতে হয়েছিল।

ঘটনার আগের দিন ৮ ডিসেম্বর বিকালে আশুগঞ্জের দখল নিতে দুর্গাপুর ও তার আশেপাশের কয়েকটি গ্রামে অবস্থান নেয় ভারতীয় মিত্র বাহিনী এবং আমাদের ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাহসী যোদ্ধারা । মিত্রবাহিনীর আর্টিলারি ইউনিট আশুগঞ্জে পাকিস্তানি হানাদারদের অবস্থানের উপর বোমা নিক্ষেপ করতে থাকে। এতে করে দুই পক্ষের মধ্যে কয়েক দফা বোমা হামলা হয়। তখন আশুগঞ্জে পাকিস্তানি আর্মিদের শক্তিশালী ঘাটি ছিল। সম্ভাব্য বিপদ আচ করতে পেরে ঐদিন রাতেই পাকিস্তানি বিপুল সংখ্যক সৈন্য আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের আবাসিক এলাকা ডি টাইপের কলোলীর পুর্ব উত্তর ও দক্ষিণ দিকের সীমানা প্রাচীরের ভিতরে ব্যাঙ্কার খুঁড়ে সীমানা দেওয়াল ঘেঁষে ট্যান্ক বিধ্বংসী কামানসহ অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্র নিয়ে উৎপেতে থাকে। ৯ ডিসেম্বর সকালে পাকিস্তানের ১৪ ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল আব্দুল মজিদ কাজীর নির্দেশে মেঘনা ব্রীজের আশুগঞ্জ অংশের একটি স্পেন ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। ব্রীজটি ধ্বংস করার কারণ ছিল সিলেট এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া অঞ্চল দিয়ে যাতে মুক্তিযোদ্ধারা ব্রীজ ব্যবহার করে ঢাকার দিকে এগুতে না পারে। ব্রীজটি ধ্বংস করার পর ভারতীয় সৈন্যরা ভেবেছিল পাকিস্তানি বাহিনী আশুগঞ্জ ছেড়ে ভৈরবে পশ্চাদপসরণ করেছে । এ ক্ষেত্রে ভারতীয় গোয়েন্দাদের তথ্য ভুল ছিল। যার জন্য দুর্গাপুর, সোহাগপুর অতিক্রম করে ভারতীয় গোলন্দাজ ও আর্টিলারি বাহিনীর ট্যাংক বহর আশুগঞ্জ বিদুৎ কেন্দ্রের ডি টাইপের সীমানা প্রাচীরের সন্নিকটে পৌঁছার সাথে সাথেই পুর্ব থেকে সেখানে ওৎপেতে থাকা পাকিস্তানী সৈন্যরা একসাথে পাল্টা আক্রমণ চালালে ভারতীয় সৈন্যরা চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। অনাকাঙ্খিত এই আক্রমনে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ফলে এখানে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়। তারা তখন যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে দুর্গাপুর গ্রামে পশ্চাদপসরণ করে। এরই মধ্যে সরাইল থেকে মিত্র বাহিনীর আরো অনেক সৈন্য দুর্গাপুরে পৌঁছে এবং পুর্বে থেকেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও স্হানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের সেখানে অবস্থান করছিলেন। তারা সম্মিলিত ভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠিত হয়ে আবার সোহাগপুর পাল্টা হামলা পরিচালনা চালায় । এসময় ভারতীয় বিমান বাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের অবস্থানে ব্যাপক নাপাম বোমা হামলা চালায়।

ভারতীয় মিত্র বাহিনী এত অল্প সময়ে পাল্টা আক্রমণ চালাবে এবং ভারতীয় বিমান বাহিনী যুদ্ধে অংশ নিবে সেটাও তারা বুঝতে পারেনি। ভারতীয় মিত্র বাহিনীর পদাতিক,গোলন্দাজ ও বিমান বাহিনীর ব্যাপক আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে এবং তারা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। ফলে মিত্র বাহিনীর পাল্টা আক্রমণে কয়েকজন অফিসার সহ বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়। প্রত্যক্ষদর্শী কারো কারো মতে নিহতের সংখ্যা দুই শতাধিক কারো মতে আরো বেশি। এরই মধ্যে সন্ধ্যা হয়ে যাওয়া এবং উভয় পক্ষে ব্যাপক হতাহত ঘটনায় ঐ রাতে আর হামলা কিংবা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটেনি। ঘটনা বেগতিক মনে করে উক্ত যুদ্ধের পর সারারাত পাকিস্তানি সৈন্যরা নৌযান ব্যবহার করে আশুগঞ্জ ছেড়ে মেঘনা নদীর ওপার ভৈরবে গিয়ে তাদের ক্যাম্পে অবস্থান নেয়। পরদিন সকালে সোহাগপুরে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর অনেক লাশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ভারতীশ হেলিকপ্টারে করে এসব লাশ এবং আহত সৈনিকদের আগরতলায় নিয়ে যাওয়া হয়। ১০ ডিসেম্বর ভারতীয় রাজপুত ও মুক্তিযোদ্ধারা আশুগঞ্জ মুক্ত করে।
আশুগঞ্জ মুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে ৯ তারিখের সোহাগপুর যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারি ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন ক্যাপ্টেন, মেজর জেনারেল (অবঃ) সুবিদ আলী ভুঁইয়া ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং আশুগঞ্জ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন,”১০ ডিসেম্বর দ্বিতীয়বার মিত্র বাহিনীর আক্রমণের আগেই শত্রুসৈন্যরা আশুগঞ্জ থেকে সরে পড়ে এবং ভৈরব বাজারে অবস্থান নেয়”(পৃষ্ঠা- ১০০)।
এই যুদ্ধে ভারতীয় আটটি ট্যাংক অংশ নিয়েছিল এর মধ্যে পাকিস্তানি সৈনদের গোলার আঘাতে তিনটি ট্যাংকই ধ্বংস হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক নিদর্শন এই ট্যাংকের দুইটি সোহাগপুর গ্রামে এবং একটি বাহাদুরপুর গ্রামে অযত্ন অবহেলায় পড়েছিল। পরবর্তীতে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়।
১০ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ মুক্ত হলেও সেদিন আশুগঞ্জ বাজার যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত এক বিরান ভূমিতে পরিণত হয়েছিল। আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্র আবাসিক এলাকা ডি- টাইপ,সোহাগপুর, খাদ্য গুদাম এলাকায় রেললাইনের ব্যাংকারে পাকিস্তানি সৈন্যদের অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ১০ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ পাকিস্তানি হাদার মুক্ত হলেও নদীর ওপার ভৈরব বাজারে তখন কয়েক হাজার পাকিস্তানি সৈন্য অবস্থান করতে থাকে। তারা ভৈরব থেকে আশুগঞ্জে সেলিং করতে থাকে। আশুগঞ্জ থেকে ভারতীয় মিত্র বাহিনী ও ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্যরা ভৈরবে পাকিস্তানি হানাদারদের উপর পাল্টা আঘাত করতে থাকে।
ঐ সময়ের পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে ঐ যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী মেজর জেনারেল (অবঃ) সুবিদ আলী ভুইয়া ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং আশুগঞ্জ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “চোখের সামনে তখন শুধু যুদ্ধের ভয়াবহ মুর্তি। দেখতাম বজ্রের মতো আকাশ কাঁপানো শব্দে কামানের গোলা ফেটে পড়ছে। আর শেলের আঘাত থেকে আত্মরক্ষার জন্য আমাদের জোয়ানরা মাটিতে শুয়ে পজিশন নিচ্ছে। শত্রুকে লক্ষ্য করে হাতিয়ার তাক করে প্রত্যুত্তরে দিচ্ছে সামনে। ভয়ে পিছিয়ে না যেয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে তখনো সবাইকে বারুদের মতো জ্বলতে দেখেছি। প্রতিশোধের স্পৃহায় তখন সবাই বদ্ধপরিকর” (পৃষ্ঠা-১০২)।
১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদারদের আত্মসমর্পণের পুর্ব পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় তারা আত্মসমর্পণ করলেও ভৈরবে পাকিস্তানিরা আত্মসমর্পণ করে ১৮ ডিসেম্বর। প্রকৃতপক্ষে ১৮ ডিসেম্বরের পুর্ব পর্যন্ত আশুগঞ্জে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসেনি।
লেখক : সাবেক ছাত্রনেতা,মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, লেখক – ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং আশুগঞ্জ’, সাধারণ সম্পাদক স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ। ইমেইল salamshaju@yahoo.com