ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও একটি স্মৃতি

অধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান আলম সাজু: কোভিট-১৯ করোনায় আক্রান্ত হয়ে গতকাল ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে মিলিটারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি, ভারত বর্ষের বর্ষিয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মান্যবর প্রনব মুখার্জি। অত্যন্ত সাধাসিধা জীবন যাপন করতেন তিনি। একজন বিশুদ্ধ বাঙালি প্রণব মুখার্জির পরলোগমনে বাংলাদেশের একজন অকৃত্রিম বন্ধু হারাল। এই উপমহাদেশ হারালো একজন জ্ঞানতাপস বহুমাত্রিক রাজনীতিবিদকে।

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চরম দুঃসময়ে প্রণব মুখার্জি তাঁর জানপ্রাণ উজাড় করে দিয়ে বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাড়িয়েছিলেন। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন প্রণব মুখার্জি। সেই সুবাদে মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকারকে বাংলাদেশের পক্ষে, বঙ্গবন্ধুর পক্ষে কাজ করতে প্রভাবিত করেছেন তিনি। পচাত্তর পরবর্তী চরম দুঃসময়ে বঙ্গবধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনার চরম দুঃসময়ে প্রণব মুখার্জি বটবৃক্ষের মত ছায়া দিয়ে রেখেছেন। বাঙালি জাতি প্রণব মুখার্জির এই অবদান চিরদিন শ্রদ্ধার সাথে স্মরণে রাখবে।

তিনি অত্যন্ত সাধাসিধা জীবন যাপন করতেন। আমার সুযোগ হয়েছিল নয়া দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে তার সাথে সাক্ষাতের। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ভারত বর্ষের মহামান্য রাষ্ট্রপতির সাথে স্বাক্ষাতের পর তাঁর বিনয় দেখে অবাক হয়েছিলাম। একজন মানুষ যে কতটা বিনয়ী হতে পারে শ্রী প্রণব মুখার্জির সাথে সাক্ষাত না হলে সেটা হয়ত আমার অজানাই থেকে যেত। তাঁর সাথে সেদিনই প্রথম দেখা। অথচ মনে হলো তাঁর সাথে যেন আমাদের জনম জনমের পরিচয়। ভারত বর্ষের প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের দেশের রাষ্ট্রপতি তাঁর মায়াভরা মুখটি বার বার আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

২০১৬ সালে আমি এবং আমার রাজনৈতিক সহকর্মী, সুপ্রিয় বন্ধু, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের সম্মানিত হুইপ জনাব আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন ও অধ্যক্ষ আব্দুর রাজ্জাক নয়াদিল্লীতে সফরকালে ভারতের রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জির সাথে সৌজন্য সাক্ষাত করার সুযোগ পেয়েছিলাম। সুযোগটি করে দিয়েছিলেন আমারই আরেক বন্ধু ভারতের পশ্চিমবঙ্গের এম এল এ জনাব আবু তাহের ভাই। সেদিন আমরা বেশ কিছু সময় শ্রী প্রণব মুখার্জির সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। সৌজন্য সাক্ষাতের এক পর্যায়ে আমি আমার লেখা ‘শেখ হাসিনা যখন কারাগারে’ এবং ‘শেকড়ের সন্ধানে’ বই দুটি ভারতের রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দিলে তিনি বই দুইটি হাতে নিয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখতে থাকেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার গ্রেফতার এবং তাঁর মুক্তির দাবিতে দেশব্যাপী তীব্র আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি ও খুটিনাটি দেখছিলেন। আমি একজন রাজনৈতিক কর্মী এবং লেখালেখির সম্পৃক্ত জেনে তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে সেদিন আমাকে আদর করেছিলেন। এতে আমি পরম সম্মানিত বোধ করছিলাম। আমার মত একজন অতি ক্ষুদ্র লেখকের প্রতি তাঁর এই ভালোবাসা দেখে সেদিন মুগ্ধ হয়েছিলাম।

একজন মানুষ যে কত বিনয়ী হতে পারেন তা শ্রী প্রণব মুখার্জির কাছে যেতে না পারলে হয়ত আমার অজানাই থেকে যেত। পরে জেনেছি জনাব প্রণব মুখার্জি একজন বইপোকা মানুষ। তিনি অবসর সময়ে প্রচুর বই পড়েন। আমার দেখা শ্রেষ্ঠ মানুষদের অন্যতম শ্রী প্রণব মুখার্জি।

তিনি বেশ কিছু দিন থেকেই অসুস্থ ছিলেন। মনের অজান্তেই প্রতিদিনই তাঁর শারিরীক অবস্থা জানার একটা তাগিদ অনুভব করতাম। সেজন্য প্রতিদিনই মিডিয়ার মাধ্যমে তাঁর শারীরিক আপডেট জানার চেষ্টা করতাম। গতকাল রাতে তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনার পর কেন যেন মনে হল আমি আমার একজন অতি আপজনকে হারালাম। বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি শ্রী প্রণব মুখার্জির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ ও সদস্য সচিব, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট