‘পিঁপড়ের শৃঙ্খলা আর কাকের একতা সাংবাদিকদের অনুকরণীয় হতে পারে’

আহমেদ আবু জাফর: পিঁপড়ের মাঝে শৃঙ্খলা, কাকের মাঝে একতা, কুকুরের মাঝে বিশ্বস্ততা, পায়রার মাঝে স্বচ্ছতা, ঘোড়ার মাঝে পরিশ্রম, মৌমাছির মাঝে সাম্যতা দেখে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে শিক্ষা নেওয়া উচিত।

করোনার ছোবল আর পবিত্র ইদের সাম্য ও ত্যাগের শিক্ষার মধ্য দিয়ে মানুষের মাঝে হিংসা, ক্রোধ, লোভ, নিষ্ঠুরতা, অহংকার এখনি ছেড়ে মনুষত্ব লালন করুন।

ঐক্য শিক্ষার মধ্য দিয়ে আজ নতুন করে গড়ে উঠুক আমাদের প্রিয় পেশা সাংবাদিকতার জাতীয় ঐক্য। সাংবাদিকদের মাঝে চরম অনৈক্য আজ পেশাটিকে রীতিমত অনিশ্চিয়তার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজছে মফস্বলের সাংবাদিকরা। প্রয়োজন সাংবাদিকদের জাতীয় নেতৃবৃন্দের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে দাঁড়ানো। একদিকে সাংবাদিক নির্যাতনের চিত্র চোখের সামনে দেখেও যেন আমরা মুখ ফিরিয়ে ইজ্জ্বত রক্ষা পাই। যেটি অন্যপেশায় বিরল।

মনে করুন, কোথাও প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ফাঁড়ির একজন পুলিশ কনস্টেবল, কিংবা ইউনিয়ন ভূমি অফিসের পিওন-চাপড়াশি অথবা গ্রাম স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এমএলএসএসের দায়িত্বে অবহেলার দায়ে গায়ে হাত তোলা হলে দেশে ঝড় বয়ে যায়। ওই গ্রাম পুরুষ শুন্য হয়ে পড়ে।

যাত্রী হয়রানির দায়ে একজন গাড়ির হেলপারের গায়ে হাত তোলা হলে সারাদেশে পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়। কিন্তু একজন সাংবাদিককে হত্যা-নির্যাতন করা হলে পানিও নড়েনা। নিজ কর্মস্থলের কিছু রাক্ষুসে সাংবাদিকরা তখন হামলাকারীর পক্ষ নিয়ে নির্যাতনের শিকার সাংবাদিকের বিরুদ্ধে তার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধারে নেমে পড়েন। যেন উল্টো তার বিচারের দাবি তোলেন।

দেখুনতো, কোথাও একটি কাক বিপদে পড়লে কিভাবে শতশত কাক তেড়ে আসে। কাকের মধ্যে কি বিরল ঐক্য। আমরা কিন্তু কাকের চিত্র থেকেও শিক্ষা নিতে পারি।

আজকাল সাংবাদিকদের নির্যাতনের মোক্ষম হাতিয়ার ফেসবুক। যদি কোন দস্যু, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ করা হয়। তবে দস্যুতার পক্ষ থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অথবা চাঁদাবাজির মামলা নয়তো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সাংবাদিককে উদ্বারে নেমে পড়ে। মামলার সাথে সাথে আসামি সাংবাদিক হন দ্রুত গ্রেফতার। পক্ষান্তরে সাংবাদিক বাদী হলে আসামির যেন খোঁজ মেলেনা।

তেমনি কক্সবাজারের কুতুবদিয়ার এক ইয়াবা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মিডিয়ায় সংবাদ প্রকাশ হলে স্থানীয় এশিয়ান টেলিভিশনের প্রতিনিধি মিজানের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চাঁদাবাজ বানাতে যেন উঠে পড়ে লেগেছে।

সাংবাদিক হয়রানির নয়াকৌশলে আক্রান্ত হয়ে কারাবাস করছেন রাজধানীর উত্তরখার এলাকার প্রিন্স আহমেদ। দৈনিক দেশপত্র পত্রিকার সাংবাদিক। স্বামীর বন্ধু জনৈক আকতার গাজী চেতনানাশক খাইয়ে ধর্ষণ শেষে নগ্ন ছবি ও ভিডিও তুলে একাধিক ধর্ষণের কবল থেকে মুক্তির উপায় খুঁজতে সাংবাদিক প্রিন্সের অফিসে স্মরণাপন্ন হন এক নারী। প্রিন্স বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত শেষে সংবাদ প্রকাশের পরামর্শ দেন। ইতিমধ্যে বড় অংকের বিনিময়ে দু’পক্ষের সাথে বিষয়টি মিমাংশা হয়ে যায়। নারী ও তার স্বামী টেনশনে পড়েন প্রিন্সের কাছে থাকা ভিডিও উদ্ধারে। নারীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে সম্প্রতি প্রিন্সকে টংগী পূর্ব থানা পুলিশ তাকে গেপ্তার করেন।

সম্প্রতি ওই নারী এবং তার স্বামী মিলে সংবাদ প্রকাশের জন্য স্বেচ্ছায় তথ্য উপকরণ প্রিন্সের মোবাইলে দিয়েছিলেন। সেটি তার মোবাইলে থাকায় ব্লাকমেইলের মিথ্যা অভিযোগ তুলে পুলিশ দিয়েই তাকে আটক করানো হয়। এরূপ সাংবাদিক নির্যাতন-হয়রানির অহরহ চিত্র নিত্যদিনের। পান থেকে চুন খসলেই যেন আজ সাংবাদিকের ঠিকানা হয় কারাগার। এসব অবস্থার জন্য সাংবাদিক নেতৃবৃন্দকে দায়ী করতে হয়। কারণ, ৫০ বছরের গণমাধ্যম অঙ্গনে কেন নেতৃত্ব নেই? পেশাটি রক্ষায় কেন কারো কোন দায়িত্ব নেই?

তাই আসুন; খাদে পড়া সাংবাদিকতা পেশাটির ঐতিহ্য, মর্যাদা রক্ষায় আরেকবার দায়িত্ব নিন।

ইদ মোবারক। ঘরে থাকুন, নিরাপদে থাকুন, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন। সাংবাদিকদের ভালবাসুন। সাংবাদিক নির্যাতনকে না বলুন…।

লেখক: আহমেদ আবু জাফর, প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম