দিনে দিনে আমাদের চেতনা কি ভোতা হয়ে যাচ্ছে?

অধ্যক্ষ মোঃ শাহজাহান আলম সাজু: ১৭ সেপ্টেম্বর ছিল ঐতিহাসিক শিক্ষা দিবস। অনেকটা নীরবেই এবার ঐতিহাসিক এই দিনটি পেরিয়ে গেল। বাঙ্গালি জাতিকে দাবায়ে রাখার কৌশল হিসাবে সামরিক জান্তা আয়ুব খানের শিক্ষা সংকোচন নীতি চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ১৯৬২ সালের এই দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা রাজপথে নেমে এসেছিল। তাঁরা রাজপথে ঢেলে দিয়েছিল বুকের তাজা রক্ত। কুখ্যাত শরীফ কমিশনের সেই শিক্ষানীতিতে পূর্ববাংলার শিক্ষার্থীদেরকে অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত এবং বাংলা বর্ণমালাকে উর্দূ বর্ণমালায় লিখার প্রস্তাব করা হয়েছিল। স্বৈরাচারী আয়ুব খানের শিক্ষা সংকোচন এই নীতির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে বুকের রক্ত ঢেলে দিয়েছিল বাংলা মায়ের দামাল সন্তান মোস্তফা, ওয়াজিউল্লাহ, বাবুল সহ নাম না জানা আরো অনেকেই।

রবীন্দ্র চর্চা বন্ধ, উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সংকোচিত করা,ছাত্র রাজনীতি বন্ধ সহ বাঙ্গালি জাতিকে শোষনের বেড়াজালে বন্ধি করে রাখার সব ব্যবস্থাই করা হয়েছিল শরিফ কমিশন নামক সেই কুখ্যাত শিক্ষানীতিতে।

গণবিরোধী কুখ্যাত শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে সেদিন শুধু ছাত্ররাই নয়, এদেশের আপামর বীর জনতা সেদিন রাজপথে নেমে এসেছিল। জনতার তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের মুখে সেদিন পাকিস্তানী সামরিক জান্তা জেনারেল আয়ুব খান পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল। ১৯৬২ ছাত্র আন্দোলন সেদিন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব চলমান বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনকে শানিত করেছিল। ১৯৬৬ র ছয় দফা,১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান,৭০ এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি জাতির জনক ব্ঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্ত হয়েছিল।

জাতির চেতনাকে জাগ্রত করার এই দিনটিকে আমরা যেন ভূলে যেতে বসেছি। ১৯৬২’র এই দিনে আন্দোলনটি মুলত ছাত্রদের হলেও সেদিন সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। গতকাল বাংলাদেশ ছাত্রলীগ,ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সহ কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের হাইকোর্টের সামনে শিক্ষা চত্বরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ছাড়া অন্য কোন কর্মসূচী চোখে পড়েনি।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম্য এবং পত্র পত্রিকায় বিবৃতিতে দাতা শিক্ষক সংগঠনের সংখ্যা কম করে হলেও অর্ধশতাধিক। কিন্তু গতকাল একমাত্র স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ (স্বাশিপ) ছাড়া আর কোন সংগঠনকে দিবসটি পালন করতে দেখা যায়নি। স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত শিক্ষক দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ১৯৬২ র শিক্ষা আন্দোলনের সক্রিয় নেতা, সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এডভোকেট আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি এবং বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বাসসের চেয়ারম্যান আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

শিক্ষা আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সাবেক ছাত্রনেতা ও প্রবীন শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ গতকাল আমাকে ফোন করে স্বাশিপ ছাড়া অন্য কোন শিক্ষক সংগঠনকে দিবসটি পালন করতে না দেখে হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি স্বাশিপের পক্ষ থেকে শিক্ষা দিবস পালনের জন্য বার বার আমাকে ধন্যবাদ ধন্যবাদ জানাচ্ছিলেন। গতকাল ও আজকের পত্রিকায় অধ্যক্ষ কাজী ফারুক এবং আমার লেখা ছাড়া শিক্ষা দিবসে অন্য কারো লেখাও পত্রিকায় তেমন চোখে পড়েনি।

প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক শিক্ষকক এবং শিক্ষক নেতাকে এই চাই,সেই চাই দাবিতে ঝড় তুলতে দেখা যায়। দেশের জন্য,জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য জাগ্রত রাখার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ লক্ষ্য করা যায় না। এটা কি তাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না? শিক্ষকরা হলেন জাতির বাতিঘর। তাদের যত অভাব অভিযোগই থাকুক তারাইতো জাতিকে পথের সন্ধান দেখাবে। অন্ধকারে আলোর জ্বালাবে। কিন্তু আমরা সবাই যেন কেমন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছি। আমরা আমাদের নিজ নিজ স্বার্থের বাইরে যেন ভাবতে পারছিনা। আমরা আমাদের স্বার্থের কথা বলছি অথচ আমাদের গর্বের, চেতনার, সংগ্রামের, ঐতিহ্যের ইতিহাস তুলে ধরতে এগিয়ে আসছি না।

শুধু শিক্ষা দিবস নয়। জাতীয় ইতিহাস ঐতিহ্য, সভ্যতা,সংস্কৃতির গৌরবদীপ্ত দিবস সমূহ পালনে আমরা যেন উদাসীন হয়ে পড়ছি। সরকারি বাধ্যকতা না থাকলে জাতীয় অনেক দিবস হয়ত এতদিনে আমরা ভুলেই যেতাম। একটা জাতির জন্য এটা খুবই হতাশাজনক। একটা জাতিকে এগিয়ে নিতে তার চেতনাই মুল শক্তি। চেতনাই যদি ভোতা হয়ে যায় জাতি পথচলাও স্তিমিত হয়ে যাবে।

এটাও ঠিক অতিদ্রুত উন্নয়নশীল বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। শিক্ষার সংকট নিরসনে টেকশই কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষকদের আর্থিক প সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। এ জন্য বাজেট শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কোন দেশেই শুধুমাত্র রাষ্ট্রের একার পক্ষে কোন কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সকলের সমন্বিত উদ্যোগ। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি আমাদেরকেও সহযোগিতার হাত বাড়িতে দিতে হবে।

লেখক: কারানির্যাতিত সাবেক ছাত্রনেতা, সাধারণ সম্পাদক: স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ, সেক্রেটারি: ওয়ার্ল্ড ফেরারেশন অব টিচার্স ইউনিয়ন (WFTU)।
শীর্ষবাণী/এনএ