দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের ওসিসহ ৭জনের বিরুদ্ধে মামলা, নির্যাতিতাকে ডেকেছে এসপি অফিস

ঢাকা অফিস : দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার পুলিশসহ সাতজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা এক নারীর অভিযোগের তদন্ত শুরু হয়েছে। আজ ১৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা জেলার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ভুক্তভোগী ওই নারীকে ডেকে নিয়ে তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও ওসি তদন্তসহ কয়েকজন পুলিশের বিরুদ্ধে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন মাহমুদা নামের ওই ভুক্তভোগী নারী। তার অভিযোগের ভিত্তিতে ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার তাকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে ডাকা হয়। এর আগে গত ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার চার নম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক তাবাসুম ইসলামের আদালতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার দুই ওসিসহ ৭জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওই নারী। আদালত তার জবানবন্দি গ্রহণ করে পুলিশকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।

আদালতে দায়ের করা মামলার আসামিরা হলেন, কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন (৫৫), ফার্স্ট ফাইন্যান্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তুহিন রেজা (৪০), রাহাত ওরফে ডাকাত রাহাত (৩৫), জি এম সারোয়ার (৫৫), দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) শাহাদাত হোসেন, ইন্সপেক্টর (তদন্ত) আশিকুজ্জামান ও অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ জামান। ওই মামলায় অজ্ঞাতনামা আরো ৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার সূত্র জানায়, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যার মীরেরবাগে দুই কন্যাসন্তান নিয়ে মামলার বাদী বসবাস করতেন। আর তিনি একটি পার্লারে চাকরি করে সংসার চালাতেন। গত ৩০ জুন তিনি দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ এলাকায় গণ-পাশবিকতার শিকার হন। এ ঘটনায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায় একটি মামলা রয়েছে। গত ৫ জুলাই ওই মামলার এক নম্বর আসামি ইকবাল হোসেনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলার অপর আসামিরা পুলিশের সহায়তা নিয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ায়। আর মামলা তুলে নেওয়ার জন্য বাদী ও সাক্ষীদের চাপ প্রয়োগ করে। এরপর গত ২১ জুলাই তাকে অস্ত্রের মুখে হত্যার হুমকি প্রদান করে তার দুই সন্তানকে জিম্মি করে ২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। কখন তাদেরকে নগদ দশ হাজার টাকা দেন। আর এ ঘটনাটি তার মোবাইলে তিনজন পুলিশ সদস্যকে জানান। পরে মামলার আসামি ডাকাত রাহাতসহ চার পাঁচজন তাকে অপহরণ করে ইকবাল চেয়ারম্যানের তেলঘাটের অফিসে নিয়ে যায়। সেখান থেকে তাকে একটি গাড়ি যোগে পল্টন থানাধীন বিজয়নগর সাইমন স্কাইভিউ টাওয়ারের সাততলায় নিয়ে আটক করা হয়। এরপর ইকবাল চেয়ারম্যান, জি এম সারোয়ার ও তুহিন রেজাসহ আরো কয়েকজন সেখানে প্রবেশ করে। পরে অস্ত্রের মুখে তাকে জিম্মি করে তাদের শেখানো কথা রেকর্ড করে নেয়। পরে তাকে ধর্ষণ মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেয়। আর মামলা তুলে না নিয়ে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দেওয়া হয়।

অভিযোগে জানা গেছে, ২৩ জুলাই ইকবাল চেয়ারম্যান, তুহিন রেজা ও জি এম সারোয়ারের হুকুমে রাহাত ডাকাত তাকে আবারও অপহরণ করে। আর এ ঘটনাটি পুনরায় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের তিন পুলিশকে জানানো হলেও পুলিশ তাকে নিরাপত্তা না দিয়ে তাদের সাথে চলে যেতে বলে। পরে তারা মামলার বাদীকে নজরুল ইসলাম স্মরণির অক্রাম টাওয়ারের লিফটের সাততলায় এক রুমে নিয়ে বসায়। পরে সেখান থেকে রমনায় বারে নিয়ে যায়। ইকবাল চেয়ারম্যান, তুহিন রেজা ও জি এম সারোয়ার ২৬ জুলাই কোর্টে গিয়ে তাকে ২২ ধারায় জবানবন্দি দিতে বলে। আর তা না দিলে মাদকের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেবে বলে হুমকি দেয়। পরে শর্তসাপেক্ষে তাকে মুক্তি দেন তারা। এরপর গত ২৬ জুলাই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন তার বাসায় গিয়ে রাহাত ডাকাতসহ অজ্ঞাতনামা চার-পাঁচজনের হাতে তুলে দিয়ে কোর্টে নিয়া যাওয়ার কথা বলে। আর মামলা বাদী যেন পালাতে না পারেন তাও বলা হয়। পরে তাকে কড়া পুলিশী প্রহরায় কোর্টে নিয়ে সাত-আটটি কাগজে স্বাক্ষর নেয়। আর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বেলা ১২টার দিকে কোর্টে গিয়ে তাকে বলেন, ‘যদি চালাকি করিস তবে তোর মেয়ে দুটোর জীবন হারাতে হবে। ইকবাল চেয়ারম্যান লোকজন দিয়ে হত্যা করবে। এরপর তিনি বাধ্য হয়ে আদালতে তাদের শেখানো কথা বলেন। পরে মামলা তদন্ত কর্মকর্তা তাকে গেন্ডারিয়া ফাঁড়িতে নিয়ে বেশকিছু কাগজপত্রে স্বাক্ষর নিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেন।

আজ ১৫ সেপ্টেম্বর মামলার বাদি মাহমুদা বেগম গণমাধ্যমকে জানান, আদালতে মামলা দায়ের করা হলেও এখনো ওই মামলার বিষয়ে কোন কর্মকর্তা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। তবে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। ওই অভিযোগের বিষয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ডেকেছিলেন বলে জানান তিনি।

এরআগে এ ব্যাপারে শুভাঢ্যা ইকবাল চেয়ারম্যান গণমাধ্যমকে বলেন, বাদী আমার কাছে মামলার ২ নাম্বার আসামি তুহিন রেজা (৪০) এর বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আসে, কিন্তু অভিযুক্ত তুহিনকে দেখে সে বলে এই তুহিন না অন্য তুহিন। তখন আমি ঐ নারীকে বলি এই তুহিন না হলে তাহলে তার বিরুদ্ধে আপনার কোন অভিযোগ নেই। পরে শুনি আদালতে আমার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। কোন যৌক্তিক কারণ ছাড়া এমন হলে জনপ্রতিনিধি হয়ে বিচারও করা যাবেনা। এটা সম্পুর্ণ মিথ্যা মামলা। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র।