ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (র.): আদর্শ শিক্ষাবিদ ও দাঈ ইলাল্লাহ্

ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহ : ড. খোন্দকার আ.ন.ম. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদীস বিভাগের মরহুম অধ্যাপক। দেশে কামিল ও ইন্টারমিডিয়েট এবং বিদেশে অনার্স, মাস্টার্স, এম.ফিল ও পিএইচ.ডি সফলতার সাথে সম্পন্ন করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন। আমরা যখন মদীনায় পড়ি তখন তিনি রিয়াদে মাস্টার্সের ছাত্র। কিন্তু সেখানে বসে তার সাথে পরিচয় হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর প্রথম পরিচয় হয়। জ্ঞানের দ্যুতি ছড়ানো চাহনি আর হাস্যোজ্বল মুখবয়বের আকর্ষণে প্রথম সাক্ষাৎ থেকেই দ্বীনি মহব্বতেরর যাত্রা। বয়স ও একাডেমিক সেশনে ১০/১২ বছরের জ্যেষ্ঠ হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের ব্যবধান ৬/৭ মাস হওয়ায় ভাই বলেই সম্বোধন করতাম। কখনো কখনো স্যারও ডাকতাম। তিনি আমাকে আদর করে দুক্তুর (ড. এর আরবী প্রতিশব্দ) ডাকতেন। তুখোর মেধাবী, অধ্যবসায়ী ও মুখলিস ছিলেন। বিনয়ী, সদা হাস্যোজ্বল ও ভাল মনের মানুষ হিসেবে তার জুড়ি মেলা ভার। তার কোন লেখা বা বত্তৃতায় ব্যক্তিবিশেষ বা গোষ্ঠীবিশেষের প্রতি কোন বিষোদগার ছিল না। একটাই উদ্দেশ্য সুন্নাহ বিমুখ উম্মাহকে সুন্নাহমুখী করা এবং বিদআতের অপসারণ। তার লেখনী পাঠককে চুম্বকের মতো আকৃষ্ট করে। যেটা সালাফদের মধ্যে শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া, ইমাম নববী, ইমাম সুয়ূতী প্রমুখের লেখনীর ব্যাপারে প্রসিদ্ধি আছে।

আমি নিজেও তার যে কোন বই পড়া শুরু করলে সময় জ্ঞান কাজ করে না। যে কোন বই লিখতে গেলে বা শিরোনাম নির্ধারণে মাঝেমাঝে পরামর্শ করতেন। কোন কোন বইয়ের পাণ্ডুলিপিও দেখেছি, তবে আমি খুব কম দেখলেও আমাদের মুরব্বী ড. আবু সিনা ভাই প্রায়শই এটা করতেন। আবার ক্যাম্পাসে যাওয়ার পথে গাড়ীতে বসে বিভিন্ন প্রশ্ন করে ব্যস্তও রাখতেন সিনা ভাই। এতে তিনি কখনো বিরক্ত হতেন না। এত চমৎকার বাংলা কোথায় শিখেছেন জানতে চাইলে মুচকি হেসে বললেন, আমি যখন ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি তখন বাজারে বাংলা ভাষার যত গদ্য, পদ্য, সাহিত্য, উপন্যাসের বই ছিল কিছুই পড়তে বাদ রাখিনি, হয়ত এ কারণে কিছু বাংলা শিখা হতে পারে।

সবচাইতে অবাক করার মত বিষয় হলো উপমহাদেশের একটি প্রতিষ্ঠিত পীরের দরবারকে তিনি সহীহ সুন্নাহমুখী করতে সক্ষম হয়েছেন যা লাখ লাখ মানুষের মাঝে তাওহীদের সঠিক জ্ঞান প্রচারে সহায়ক হয়েছে। দ্বীনবিমুখ মানুষদেরকে দ্বীনমুখী করা, তাওহীদের সঠিক জ্ঞান প্রচার করা ও খ্রিষ্টান মিশনারীদের অপতৎরতা থেকে মুসলমানদেরকে মুক্ত রাখার ব্রত নিয়েই তিনি দিনরাত কঠিন পরিশ্রম করে গেছেন।

২০১৬ সালের ১১ মে বুধবার। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। সকাল ৭.৩০ টার গাড়ীতে ক্যাম্পাসে রওয়ানা হয়ে ৮.১০ টায় পৌঁছে সমিতির অফিসে বসলাম। ৮.২০ টায় চায়ের কাপে মুখ দিব এমন সময় সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এমতাজ স্যার কাঁদো কাঁদো স্বরে উৎকন্ঠার সাথে ফোনে জানালেন জাহাঙ্গীর ভাইয়ের গাড়ী দুর্ঘটনাকবলিত হয়েছে এবং খবর বোধ হয় বেশী ভাল নয়। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি এবং জাহাঙ্গীর ভাইয়ের বিশেষ সহকারী বাহাউদ্দীন ভাইকে ফোন দেই। তার ফোন রিসিভ হলো না। অর্থাৎ তিনিও ঐ গাড়ীর যাত্রী ছিলেন এবং মারাত্মক আহত। এবার ফোন দিলাম আব্দুর রহমান সালাফী ভাইকে। তিনি ফোন রিসিভ করে হুহু করে বাচ্চাদের মত কেঁদে উঠে বললেন, ভাই মনে হয় আর নাই। যা বুঝার বুঝে গেলাম। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন। ভিসি স্যারকে এই দুঃসংবাদটি ফোনে জানালাম এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ী নিয়ে দুর্ঘটনাস্থল মাগুরার উদ্দেশ্য রওয়ানা হলাম। মাগুরা পৌঁছার আগেই দেখী জাহাঙ্গীর ভাইয়ের লাশ বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স ঝিনাইদহের দিকে ছুটছে। আমরাও এ্যাম্বুলেন্সের পিছনে পিছনে আসলাম। তার বাড়ী এসে মৃতদেহ দেখে মনে হলো স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভে ধন্য হাস্যোজ্বল চেহারার এক ঘুমন্ত শহীদ। মনের অজান্তে সজোরেই অনেকক্ষণ কাঁদলাম। একমাত্র ছেলে উসামা বিদেশে থাকায় একদিন পরে তার ইমামতিতেই জানাযা হলো। লাখো মুসল্লীর দুআ ও ভালবাসায় সিক্ত হলেন জাহাঙ্গীর ভাই।

ঝিনাইদহবাসী প্রত্যক্ষ করলো এক অভূতপূর্ব জানাযা। তার মৃত্যুর মাধ্যমে উম্মাহ হারালো এক সূর্য সন্তানকে আর অবসান হলো একটি চলন্ত লাইব্রেরীর, অপূরণীয় ক্ষতি হলো জাতি ও রাষ্ট্রের। হে আল্লাহ! আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন জাহাঙ্গীর স্যারের সকল খিদমত কবুল করো এবং তাকে শহীদী মর্যাদা দিয়ে বেহেশতের সর্বোচ্চ মাক্বামে আসীন করো। আর তার মতো আদর্শ ও মুখলিস দাঈর শূন্যতা পূরণ করে দাও। আমীন।

লেখক : ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহ
অধ্যাপক, দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, কুষ্টিয়া।