কৌশলগত মজুদ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে জ্বালানি তেলের বাজার এখন আকাশচুম্বী। সরবরাহ সংকটে দাম রেকর্ড ছুঁয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত মজুদ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। মজুদ থেকে প্রতিদিন ১০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহের নজিরবিহীন এ নির্দেশনা ছয় মাস অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। খবর বিবিসি ও এএফপি।

সৌদি আরবের পর বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ জ্বালানি তেল উৎপাদক দেশ রাশিয়া। ইউক্রেনে হামলার জেরে দেশটির জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি মিত্র দেশ। এছাড়া যুদ্ধ শুরুর পর পরই জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক বাজার অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলারে পৌঁছায় দাম। বর্তমান কিছুটা কমলেও এখনো উচ্চমূল্যে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে বিশ্ববাসীকে। এ অবস্থার মধ্যেই জ্বালানি তেলের দাম কমানোর জন্য নিজেদের কৌশলগত মজুদ থেকে সরবরাহ বাড়ানোর জন্য বৃহস্পতিবার নির্দেশ দেন বাইডেন। এতে ওইদিনই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কিছুটা কমে।

কৌশলগত মজুদ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়ানোর নির্দেশনাসংক্রান্ত একটি বিবৃতি দিয়েছে হোয়াইট হাউজ। বিবৃতিতে বলা হয়, মিত্র ও অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করে জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়ানোর এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। কৌশলগত মজুদ থেকে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে। ছয় মাস এ নির্দেশনা বলবৎ থাকবে।

এটিকে নজিরবিহীন আখ্যা দিয়ে হোয়াইট হাউজের বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বিশ্বে দৈনিক এ পরিমাণ এবং এত সময়ের জন্য কোনো দেশ এর আগে নিজেদের মজুদ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করেনি। এ সরবরাহ আপাতত বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য। এ বছরের শেষেই আবার বাড়তি উৎপাদনের মাধ্যমে পরিস্থিতি অনুকূলে আনার চেষ্টা করা হবে।

যদিও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কৌশলগত মজুদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের এ সরবরাহ জ্বালানি তেলের বাজারে তেমন প্রভাব ফেলতে পারবে না। দেশটির এ উদ্যোগে আন্তর্জাতিক বাজারে ১ শতাংশের মতো জ্বালানি তেল সরবরাহ বাড়তে পারে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির এক প্রাক্কলন বলছে, চলতি বছরে বৈশ্বিক বাজারে দৈনিক ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেলের চাহিদা হতে পারে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ চাহিদা মেটাতে খুব একটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ সরবরাহ বাড়ানো যতটা না আন্তর্জাতিক বাজার সহনীয় করতে, তার চেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে। মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে এরই মধ্যে চাপে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন। করোনা অতিমারীতে বিধ্বস্ত অর্থনীতি টেনে তোলার ভার তার ওপর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব সামলাতে হচ্ছে। জ্বালানি তেলের রেকর্ড দামে নিজ দেশেই তার ওপর চাপ বাড়ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিকে ইস্যু করতে পারেন রিপাবলিকানরা। এতে ধরাশায়ী হওয়ার আশঙ্কা এখন বাইডেনের ওপর ভর করেছে। যে কারণে কৌশলগত মজুদ থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করে বাজার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন তিনি। উদ্দেশ্য নির্বাচনে যেন তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

লন্ডনভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের পণ্যবাজারবিষয়ক অর্থনীতিবিদ এডওয়ার্ড গার্ডনারের মতে, কৌশলগত মজুদ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ অল্প সময়ের জন্য বাজারে কিছুটা প্রভাব ফেলতে সক্ষম হবে। তবে জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল করতে বৈশ্বিক উৎপাদন বাড়ানই স্থায়ী সমাধান বলে মত তার।

জ্বালানি তেলের বাজারে যেকোনো অস্থিতিশীলতা নিয়ন্ত্রণের জন্য সত্তরের দশকে কৌশলগত মজুদ তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্র। এসব মজুদের অধিকাংশই রয়েছে টেক্সাস ও লুইজিয়ানার উপকূল এলাকায়। ২৫ মার্চ পর্যন্ত দেশটির হাতে ৫৬ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল মজুদ ছিল। সর্বশেষ ২০০৯ সালে সর্বোচ্চ মজুদ করতে সক্ষম হয়। ওই সময় কৌশলগত মজুদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭০ কোটি ব্যারেল।