ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ থেকে শিক্ষনীয়

ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহ: আলহামদুলিল্লাহ্। করুনাময়ের অপার মহিমায় আমরা ১৭তম সিয়ামের সকাল অতিক্রম করলাম। আজকের বিষয় “বদর যুদ্ধের শিক্ষা”। ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধ হক্ব ও বাতিলের মধ্যকার প্রথম বড় ধরনের লড়াই হিসেবে পরিচিত। দ্বিতীয় হিজরীর রমাদান মাসের ১৭ তারিখে মদীনা থেকে দূরে বদর নামক প্রান্তরে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। রাসূল মুহাম্মাদের (স.) নেতৃত্বে ইসলাম টিকে থাকবে না আবু জাহল, আবু লাহবদের নেতৃত্বে কুফর টিকে থাকবে সে ফয়সালা হওয়ার যুদ্ধ এটি। যুদ্ধে মুসলমানদের ঐক্য, ঈমানী দৃঢ়তা ও ইলাহী মদদে ৩১৩ জন নিরস্ত্র যোদ্ধা রণসজ্জায় সজ্জিত ও দক্ষ ১০০০ কাফির সেনাকে পরাস্ত করে ইসলামের বিজয় কেতন উড়াতে সক্ষম হয়। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের কতিপয় শিক্ষা নিয়ে আজকের এই লেখা।

# মুসলমানদের শত দুর্বলতা সত্ত্বেও আল্লাহর মনোনীত দ্বীন ইসলাম ক্বিয়ামত অবধি বলবৎ থাকবে।

# মানবজীবনে দুআর মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার কাছে ধরণা দেয়া ও সফলতা লাভ একটি ঐতিহাসিক সত্য ঘটনা। রাসূল স. এর দুআর বরকতে সেদিন আল্লাহ তাআলা ফিরিশতা প্রেরণ করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। কুরআনের ভাষায় “স্মরণ করো, তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট সাহায্য চেয়েছিলে তখন তিঁনি তোমাদেরকে বলেছিলেন, ‘আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক সহস্র ফিরিশতা দ্বারা, যারা একের পর এক আসতে থাকবে”। (আনফাল- ৯) এতে প্রমাণিত হয় যে, স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করতে পারলে সর্বাবস্থায়ই বিজয় সুনিশ্চিত।

# আল্লাহভীতি ও নিজেদের মধ্যে ঐক্য সুদৃঢ় করা বিজয় ও সফলতার অন্যতম মাধ্যম।

# সংখ্যাধিক্য কখনো বিজয় নিশ্চিত করতে পারে না। কেবলমাত্র আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল, আস্থা এবং ইখলাস বিজয় নিশ্চিত করার বড় হাতিয়ার।

# যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রধান সেনাপতি কর্তৃক সৈন্যদের সকল ইউনিটের সাথে পরামর্শ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেটা রাসূল স. আনসার, মুহাজিরসহ সব পক্ষের সাথে করেছেন।

# সেনাপতির চাইতে সাধারণ সৈনিকের কৌশল জ্ঞান বেশী থাকা অস্বাভাবিক নয়। যেমন হুবাব ইবনুল মুনযির রা. রাসূল স. কে বললেন, এখানে অবস্থান করা যদি অহীর আদেশ না হয় তাহলে আমরা জায়গা পরিবর্তন করে অমুক জায়গায় অবস্থান নেই, যেখান থেকে শুধু আমাদের পান করার জন্য পানির বন্দোবস্ত রেখে সকল কূপের প্রবাহ পথ বন্ধ করে দিব যাতে কাফিররা পানি না পায়। রাসূল স. এই পরামর্শে সাড়া দিয়েছিলেন।

# কোন অধীনস্তের আস্থা ও দৃঢ়তা প্রধান সেনাপতির সমপর্যায়ের বা তার চাইতে বেশী থাকা দোষণীয় নয়। যুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে রাসূল স. যখন বারবার মহান রবকে লক্ষ্য করে বলছেন, হে আল্লাহ! এই মুষ্টিমেয় লোক ধ্বংস হয়ে গেলে তোমার একত্ববাদ প্রচার করার আর কেউ থাকবে না। তখন আবু বকর রা. তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেছেন, আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন।

# আক্বাবায় আনসারদের সাথে মদীনার বাইরে গিয়ে যুদ্ধ করার কোন চুক্তি না থাকলেও রাসূলের (স.) এর প্রস্তাবের সাথে সাথে তারা নিঃশর্তভাবে নিজেদেরকে উজাড় করে দিয়েছেন।

# যুদ্ধের পূর্বে রাসূল স. যখন কুরাইশদের পক্ষে বাধ্য হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী হাশেমী বংশের লোকদেরকে হত্যা থেকে বিরত থাকার কথা বললেন তখন কেউ কেউ আপত্তি করলেও উমরের দৃঢ় সমর্থন।

# আবু জাহলের দম্ভ চূর্ণ। মুআজ ও মুাআওয়াজ দুই সহোদরের হাতে কুপোকাত হয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, একজন মানুষকে তোমরা হত্যা করছ এর চাইতে আর বেশী কী? কিছুক্ষণ পর অবস্থা আরো বেগতিক হলে বলে উঠল, হায়! কৃষক ছাড়া অন্য কেউ যদি আমাকে হত্যা করত! মৃত্যুর কিছুক্ষণ পূর্বে যখন ইবনে মাসঊদ রা. তার ঘাড়ে পা রাখল তখন বলে উঠল, হে ছাগলের রাখাল! আমি কঠিন অবস্থার মুখোমুখি। এভাবেই পতন হলো একজন আল্লাদ্রোহী দাম্ভিকের।

রমাদানের শিক্ষা পরিবর্তন নিয়ে আসুক আমাদের প্রাত্যহিক কর্মে, ফিরিয়ে আনুক আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীতকে এই কামনায়। আমীন।

লেখক : ড. মোহাম্মদ অলী উল্যাহ
অধ্যাপক, দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

সাবেক সাধারণ সম্পাদক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, কুষ্টিয়া।